শুক্রাণুদের সাঁতার অথবা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণীদের গতিবিধির কিসসা


- আতীশ ভাটিয়া*


শামুকের মত তুলতুলে হোক বা একতাল কাদার মত নরম – পদার্থবিদ্যার ভাষায় যাকে বলে অস্থিতিস্থাপক – এরকম বস্তু নিয়ে বিজ্ঞানের ক্লাসরুমে আমরা বড় একটা মাথা ঘামাই না। যে কোনও পদার্থবিদ্যার পাঠ্যবই খুললেই সাধারণত যে ছবিগুলো আপনি দেখবেন সেগুলো অনমনীয় কঠিন বস্তুর – চৌকো কাঠের ব্লক, আনত তল, টেনে বাড়ানো যায় না এমন দড়ির টুকরো, প্রভৃতির। সাধারণ অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি যে কোনো বস্তুর উপর বল প্রয়োগ করলে তার সংকোচন অথবা সম্প্রসারণ ঘটে। একটি উচ্চসীমার (elastic limit) নিচে বল প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠিন জগতের বাসিন্দারা এই প্রযুক্ত চাপ (= প্রতি একক ক্ষেত্রফলে প্রযুক্ত বল) এবং তার সংকোচন/প্রসারণ-এর মধ্যে সরলরৈখিক (linear) সম্পর্ক মেনে চলে। তুলতুলে বা না-কঠিন বস্তুরা এই নিয়মের ব্যাতিক্রমী। একমাত্র যে নমনীয় চরিত্রটিকে প্রায়শই পাঠ্যবইতে দেখা যায় সেটি হল স্প্রিং, কিন্তু সেটিও সচরাচর সম্পূর্ণ স্থিতিস্থাপক ধরে নেওয়া হয়, অর্থাৎ খুব বেশি পরিমাণে টানাটানির ফলে পূর্বাবস্থায় আর ফিরতে পারবে না এরকম পাকাপাকিভাবে বিকৃত করে দেওয়ার পরিস্থিতি বইয়ের পাতায় ঘটে না। অথচ নিচের ছবিটির খেলনা নিয়ে যে সব বাচ্চারা খেলেছে তারা রোজকার জীবনে খেলতে খেলতেই এই সরলরৈখিক জগতের সীমা কতবার পার করে গেছে।


অসরলরৈখিক 'স্প্রিং'-খেলনা


কঠিন বস্তুদের দুনিয়া যেমন আমাদের পরিচিত কিছু মূল সূত্র বা ছক হুবহু মেনে চলে, না-কঠিনদের জগৎটা আবার অনেকটাই অন্যরকম।


ক’দিন আগে যেমন আমি গেছি নৌকো বাইতে। লক্ষ্য করছি বৈঠা-টা যেমন যেমন জলের মধ্যে দিয়ে নড়ছে চড়ছে, তার গা বরাবর তৈরি হচ্ছে অসংখ্য ছোট ছোট ঘূর্ণাবর্ত। ঘূর্ণিগুলো বড় হচ্ছে, স্বধারণক্ষমতা পাচ্ছে, বৈঠার গা থেকে আলাদা হয়ে ভেসে যাচ্ছে দূরে। অবশেষে যখন ঘূর্ণিগুলোকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি ধরে রাখা আর সম্ভব হচ্ছে না, তখন তারা ভেঙেচুরে মিলিয়ে যাচ্ছে নদীর জলে।


ঊর্ধ্বমুখী ধোঁয়ার রিং বা কুন্ডলীর গতিবিধি আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন। অথবা যখন মেঘের মধ্যে দিয়ে শনশন হাওয়া বয়, তখন যে অদ্ভুত আকৃতিগুলো তৈরি হয় তার দিকেও হয়তো চেয়ে থেকেছেন। তরল বা বায়বীয় প্রবাহী পদার্থদের এই বিস্ময়কর সুন্দর জগৎটা আমাদের ক্লাসরুমের চেনা ‘কঠিন’ জগতের ধারণার বাইরে আমাদের নিয়ে যায়।


ঘূর্ণাবর্তের বিচিত্র জীবন


কিন্তু প্রবাহী পদার্থদের গতিবিধির নির্ভুল গণনা করা খুবই জটিল বিষয়। এতটাই, যে প্রবাহীদের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে যে গাণিতিক সমীকরণসমূহ, গণিতবিদ-দের কাছে তা আজও এক চ্যালেঞ্জ। এই সমীকরণ-সমূহের যে সমাধান আছে, এবং তা যে অস্বাভাবিক নয় (অর্থাৎ কোনো সিঙ্গুলারিটি নেই)-এমনটা প্রমাণ করতে পারলেই পাওয়া যাবে ১ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার। যে গাণিতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এই সমীকরণগুলির জটিলতার সৃষ্টি হয় তাকে বলা হয় অসরলরৈখিকতা (non-linearity)। সহজভাবে বলতে গেলে, অসরলরৈখিক গাণিতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুরুর পরিস্থিতিতে যৎসামান্য পরিবর্তন করলেও শেষে গিয়ে তার ফলাফল হতে পারে বিপুল। তাই একভাবে দেখলে, যে বৈশিষ্ট্য প্রবাহী পদার্থের সমীকরণগুলোকে এত জটিল করে তোলে সেই বৈশিষ্ট্যের কারণেই প্রবাহীদের আচরণ এত চমকপ্রদ এবং আশ্চর্যজনকভাবে সুন্দর। আবহাওয়ার নির্ভুল পূর্বাভাস করা যে কারণে এত কঠিন – আঞ্চলিকভাবে বায়ুর চাপ বা তাপমানে অতিসামান্য পরিবর্তনেরও ফল হতে পারে ব্যাপক, সুদূরপ্রসারী।


তাহলে এত জটিলতার মধ্যে কীভাবে এগোনো যায়? পদার্থবিজ্ঞানের একটি সাধারণ শিক্ষা বা পদ্ধতি হল এই যে যখন কোনও জটিল সমীকরণ পূর্ণাঙ্গরূপে সমাধান করা যাচ্ছে না তখন বিজ্ঞানীরা সমীকরণটিকে আরও ভালভাবে বোঝার জন্য তাকে বিভিন্ন চরম সীমায় নিয়ে গিয়ে (যে সীমায় গেলে সমীকরণটি খানিকটা সরলীকৃত হয়) সমাধান করার চেষ্টা করেন। চরম সীমায় সমীকরণের সমাধানের প্রকৃতি দেখে পূর্ণাঙ্গ সমীকরণটির সমাধান সম্পর্কে কিছু জ্ঞান এইভাবে অর্জন করা যায়। যেমন ধরা যাক, যে তরলের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা করা জটিল গাণিতিক সমস্যা, তার ঘনত্ব এবং সান্দ্রতা (viscosity) যদি অনেকটা বাড়িয়ে দিই, সেই চরম সীমায় কি তরলের ব্যবহার বুঝতে কিছু সুবিধা হতে পারে? উত্তর হল, হ্যাঁ। গ্লিসারিনের মত থকথকে ঘন তরল কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে আমাদের পরিচিত ছক ও পছন্দের নিয়ম মেনে চলে। নীচের ভিডিওটি দেখুন (হ্যাঁ, একদম শেষ পর্যন্ত!)


দেখলেন? এটা বাজি ধরে বলতে পারি যে আপনি এর আগে কোনও তরলকে এইরকম আচরণ করতে দেখেননি। তাহলে হচ্ছেটা কী? আর আমাদের লেখার শিরোনামের সাঁতারু শুক্রাণুদের সঙ্গে এই ঘন, সান্দ্র তরলের সম্পর্কটাই বা কী?


একটু পিছিয়ে গিয়ে একদম গোড়ার থেকে গল্পটা শুরু করা যাক।



মনে করা যাক উপরের ছবির মত একটি নদীর প্রবাহের কথা। জলের স্রোতের পথে যদি কোনও বাধা এসে পড়ে, ধরা যাক একটা বড় পাথরের চাঁই, তখন জল কী করে? স্বভাবতই বাধাটির পাশ কাটিয়ে বয়ে গিয়ে তারপর বাধাটির আড়ালে পৌঁছে খানিকটা জায়গায় উজানী স্রোতে ঘুরপাক খেয়ে নিয়ে মূলস্রোতে মেশে। এর ফলে স্রোতস্বিনী নদীর মাঝখানে পাথরের চাঁই-এর ‘ছায়া’র অংশটিতে আপেক্ষিকভাবে স্রোতহীন, শান্ত একটি অঞ্চলের সৃষ্টি হয়। এই অঞ্চলের প্রবাহকে আবর্ত (eddy) বলা হয়। খরস্রোতা নদীতে নৌকো চালানোর সময়ে নৌকোচালকরা এরকম অঞ্চলে নৌকো নিয়ে এসে দু’দন্ড বিশ্রাম করে নেন।


কিন্তু প্রবাহী পদার্থরা সবসময় নদীর জলের মত আচরণ করে না। আগের উদাহরণের কথা যদি ধরি, আর জলের বদলে যদি কল্পনা করি গ্লিসারিনের মত সান্দ্র কোনও তরল পদার্থের নদী, তাহলেই আর কোনও আবর্তের সৃষ্টি হবে না। পাথর জাতীয় বাধার মুখে পড়লে গ্লিসারিন-প্রবাহ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পাথরের সীমা বরাবর মসৃণভাবে বয়ে যাবে এবং পাথর শেষ হলেই বিভক্ত স্রোতদু’টি সুশৃঙ্খলভাবে একসাথে জোড়া লেগে যাবে।


সুতরাং দেখা যাচ্ছে, এক ক্ষেত্রে আমরা পাই মসৃণ, সুশৃঙ্খল প্রবাহ আর অন্য ক্ষেত্রে পাই ঘূর্ণাবর্ত, উচ্ছ্বল এবং বিশৃঙ্খল স্রোত। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কোন পরিস্থিতিতে কী ধরণের প্রবাহ আমরা দেখতে পাব, এটা আগেভাগে জানার কোনও উপায় আছে কী? পদার্থবিদ অসবোর্ন রেনল্ডস ১৮৮৩ সালে এই প্রশ্নের উত্তর খঁুজেছিলেন, এবং ভারি চমৎকার একটি মীমাংসায় পৌঁছতে পেরেছিলেন।


১৮৮৩ সালে লেখা রেনল্ডস-এর বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ থেকে প্রাপ্ত স্কেচটিতে দেখা যাচ্ছে একটি উঁচু টেবিলের ওপর চড়ে রেনল্ডস সাহেব তাঁর সান্দ্রতার পরীক্ষাটি প্রদর্শন করছেন। :)


রেনল্ডস-এর পরীক্ষাটা ছিল এইরকম। একটা সরু কাঁচের পাইপের মধ্যে দিয়ে তিনি স্বচ্ছ তরল পদার্থকে প্রবাহিত করেন (ঠিক নদীর প্রবাহের মত)। সেই প্রবাহের একটা ছোট অংশে তিনি সামান্য পরিমাণ রঙিন কালি সিরিঞ্জের সাহায্যে ঢুকিয়ে দেন। রঙের কণাগুলো (নদীর স্রোতে ডিঙিনৌকোর মত) মূল প্রবাহ অনুসারে প্রবাহিত হতে থাকে। ফলে রঙিন কালির প্রবাহে চোখ রেখে মূল তরলের প্রবাহ মসৃণ না উচ্ছ্বল সেটা পর্যবেক্ষণ করা সহজ হয়ে যায়। এরপর তিনি পরীক্ষাটির নানান উপাদান পাল্টে পাল্টে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যান, ও পরিশেষে মসৃণ, সুশৃঙ্খল প্রবাহের সংজ্ঞা এবং শর্তাবলী আবিষ্কার করেন।


রেনল্ডস-এর আঁকা তাঁরই পরীক্ষানিরীক্ষার খসড়া


রেনল্ডস তাঁর পরীক্ষার ফলাফল থেকে দেখান যে এমন একটি সহজ সংখ্যার নির্মাণ করা যায়, যার সাহায্যে প্রবাহের ধরন কী হবে তা আমরা পূর্বনির্ণয় করতে পারি। প্রবাহী পদার্থের বিভিন্ন উপাদান একত্রে নিয়ে সংখ্যাটি প্রবাহের গতিপ্রকৃতিকে বর্ণনা করতে সক্ষম হয়। রেনল্ডস-এর নামানুসারে এই সংখ্যাটির নামকরণ হয় রেনল্ডস সংখ্যা (Reynolds number, সংক্ষেপে, Re)। সংখ্যাটির সাধারণ সংজ্ঞা হল-


Re (রেনল্ডস সংখ্যা) = (ঘনত্ব x গতিবেগ x দৈর্ঘ্য)/ সান্দ্রতা


উপরোক্ত সমীকরণের ডানদিকে অবস্থিত সবকটি উপাদান সরাসরি মাপা যায়। উপাদানগুলি সম্পর্কে দু’চার কথা বলে নেওয়া যাক। প্রথমতঃ, সান্দ্রতা কী? তরলের পদার্থের আভ্যন্তরীণ ঘর্ষণের ফলে প্রবাহ কতখানি বাধাপ্রাপ্ত হয়, অর্থাৎ কত ধীরে তরলটি প্রবাহিত হয়, তার সূচক হল সান্দ্রতা। যেমন, গ্লিসারিনের মত ঘন তরলের সান্দ্রতা খুব বেশি। বায়ু বা অন্যান্য বায়বীয় পদার্থের সান্দ্রতা খুব কম। জলের সান্দ্রতা এই দুইয়ের মাঝামাঝি। রেনল্ডস সংখ্যার সমীকরণে যে ‘দৈর্ঘ্যের’ উল্লেখ আছে সেটা আমাদের আলোচ্য প্রবাহের বিশিষ্ট দৈর্ঘ্য (length scale) নির্দেশ করে। যেমন নদীর প্রবাহের উদাহরণটিতে এটা হবে পাথরের দৈর্ঘ্য। আবার, রেনল্ডস-এর পরীক্ষার উদাহরণটিতে এটা হবে পাইপের ব্যাস। সমীকরণে উল্লিখিত ‘গতিবেগ’ এবং ‘ঘনত্ব’ যথাক্রমে প্রবাহী তরলের প্রবাহের বেগ এবং ঘনত্ব, যা সরাসরিভাবে মাপা যায়।


রেনল্ডস সংখ্যার একটি বৈশিষ্ট্য এই যে সংজ্ঞা অনুসারে এটি একটি মাত্রাবিহীন সংখ্যা (dimensionless number)। অর্থাৎ, প্রবাহীর গতিবেগ, ঘনত্ব, দৈর্ঘ্য, সান্দ্রতা ইত্যাদি যে এককেই মাপা হোক না কেন (যেমন গতিবেগ মাপা যেতে কিমি/ঘন্টা বা মাইল/ঘন্টা এককে), রেনল্ডস সংখ্যা তার ওপর নির্ভর করে না। রেনল্ডস আবিষ্কার করেন যে যখন কোনও প্রবাহের ক্ষেত্রে রেনল্ডস সংখ্যাটি ২০০০ এর বেশি হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রবাহ হয়ে ওঠে বিশৃঙ্খল (turbulent)। গত জুলাই মাসের ‘সায়েন্স’ পত্রিকায় একটি নতুন পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে, যেটা রেনল্ডস-এর এই চমৎকার মীমাংসাটিকে নিবিড় ভাবে পরীক্ষা করে নির্ণয় করেছে যে রেনল্ডস সংখ্যা ঠিক ২০৪০-এর বেশী হলে সুশৃঙ্খল প্রবাহ হয়ে ওঠে বিশৃঙ্খল। (লক্ষ্যণীয় : এই নতুন পরীক্ষাটির ক্ষেত্রে মসৃণ গাত্রবিশিষ্ট নলের মধ্যে দিয়ে তরলপ্রবাহ চালিত করা হয়েছিল। পরীক্ষার অবস্থার পরিবর্তন সাপেক্ষে ২০৪০ সংখ্যাটির কিছু এদিক ওদিক হতেই পারে, কিন্তু রেনল্ডস-এর মূল দাবীটি অপরিবর্তিত থাকে। অর্থাৎ, রেনল্ডস সংখ্যা একটি বিশেষ মানের কম বা বেশি হলে সুশৃঙ্খল প্রবাহ থেকে বিশৃঙ্খল প্রবাহে রূপান্তর ঘটে অতিনাটকীয়ভাবে।)


সুশৃঙ্খল থেকে বিশৃঙ্খল প্রবাহে রূপান্তর। স্টিভেন ভোগেল এর বই Life in moving fluids: the physical biology of flow (১৯৯৬) থেকে প্রাপ্ত ছবি।


উপরের ছবি দেখলে বোঝা যাবে রেনল্ডস সংখ্যা ক্রমাগত বাড়লে প্রবাহের গতিপ্রকৃতি কীভাবে পরিবর্তিত হয়। রূপকের সাহায্যে বলা যেতে পারে, নিচু রেনল্ডস সংখ্যার (low Reynolds number) জগতটা যেন সমষ্টিবাদের আদর্শ সমাজ যেখানে পায়ে পা মিলিয়ে প্রবাহীকণারা যূথবদ্ধ ভঙ্গিমায় এগিয়ে চলে। আর উঁচু রেনল্ডস সংখ্যার (high Reynolds number) দুনিয়া যেন ব্যক্তিত্ববাদের চরম দুঃস্বপ্ন, যেখানে সমষ্টির বালাই নেই – যার যার, তার তার। একটা যদি সুসংঘবদ্ধ মিছিল হয়, আরেকটা তবে হঠকারী জনতার বিশৃঙ্খল ভিড়।


এতক্ষণ আমরা যে আলোচনা করলাম, তা ছাড়াও আর একটি সমান্তরাল রাস্তা ধরে আমরা রেনল্ডস সংখ্যার ধারণায় পৌঁছে যেতে পারি। কোনও বস্তু যখন প্রবাহী তরলে নিমজ্জিত থাকে, তখন তার ওপর দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের বল (force) ক্রিয়া করে। তার একটি হল জড়তা বল (inertial force)। এই বল কীভাবে কাজ করে? মনে করে দেখুন, সাঁতার কাটার সময় আমরা যখন পা দিয়ে জলে ক্রমাগত ধাক্কা মেরে সামনে এগিয়ে যাই, তখন জলের কণাগুলোকে তাদের স্বচ্ছন্দ অবিচ্ছিন্ন প্রবাহে বয়ে যেতে সাহায্য করে যে বল, সেটিকেই বলে জড়তা বল। দ্বিতীয় বলের নাম সান্দ্রতা বল (viscous force)। জলের প্রবাহের যাবতীয় বিশৃঙ্খলাকে মসৃণ করে তুলতে সাহায্য করে এই বল। আবার রূপকের আশ্রয় নিলে বলা যেতে পারে যে প্রবাহীকণাদের নিজ নিজ ব্যক্তিবৈশিষ্ট্য রূপ পায় জড়তা বলের সাহায্যে। অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মত সান্দ্রতা বল প্রবাহীকণাদের একটা মিলিত গোষ্ঠীরূপ দেয়। এই দুই ভিন্নধর্মী বলের অনুপাত নিলে আমরা পেয়ে যাব আমাদের পূর্বপরিচিত রেনল্ডস সংখ্যাকে।


Re (রেনল্ডস সংখ্যা) = জড়তা বল/সান্দ্রতা বল


এই রেনল্ডস সংখ্যার ধারণাটি কিন্তু নিছক তাত্ত্বিক প্রয়োজনে নির্মিত নয়। রোজকার জগতে নানা বিষয়ে এই ধারণাটি কাজে লাগে। যেমন, বৈমানিক প্রযুক্তিতে এবং জীববিদ্যায় প্রাণীদের গতিবিধি নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে এই রেনল্ডস সংখ্যাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উভয়ক্ষেত্রেই আমরা কিছু উদাহরণ দেব।


ধরা যাক, আপনি এরোপ্লেনের ডানা তৈরির নকশা এবং প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে চান। স্বভাবতই, ডানার ওপর বায়ুপ্রবাহের প্রভাব কেমন হবে তা প্রথমেই জানতে চাইবেন। এর জন্য আপনি পরীক্ষাগারে ডানার মডেল বানাবেন এবং তার ওপর দিয়ে বায়ুপ্রবাহ চালিয়ে ডানা কতটা টেকসই তা পরীক্ষা করবেন। ধরা যাক, আপনি পরীক্ষাগারে ডানার যে মডেল বানালেন তা প্রমাণ সাইজের ডানার দশ ভাগের এক ভাগ সাইজ হল।


পরীক্ষাগারের বায়ু সুড়ঙ্গে (wind tunnel) বিমানের ডানার মডেল। ছবি সৌজন্যে : NASA


এবার মনে করুন রেনল্ডস সংখ্যায় সেই সংজ্ঞা :


Re (রেনল্ডস সংখ্যা) = (ঘনত্ব x গতিবেগ x দৈর্ঘ্য)/ সান্দ্রতা


সংজ্ঞানুসারে, আপনি যদি ডানার সাইজ (দৈর্ঘ্য) দশগুণ কমিয়ে দেন, তাহলে রেনল্ডস সংখ্যা এক রাখতে হলে আপনাকে পরীক্ষাগারে বায়ুর গতিবেগ দশগুণ বাড়িয়ে দিতে হবে। তবেই আপনি পরীক্ষা নিরীক্ষা করে যে ফলাফলগুলো পাবেন তা প্রমাণ সাইজের এরোপ্লেনের ডানার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, নতুবা নয়। এখানে মূল বক্তব্য হল এই যে যদি দু’টি ভিন্ন পরীক্ষায় রেনল্ডস সংখ্যা সমমানের হয়, তাহলে সেই দুই ক্ষেত্রেই এটা বলা যাবে যে প্রবাহের গতিপ্রকৃতিও সমতুল্য হবে। ফলে রেনল্ডস সংখ্যা এক না রেখে পরীক্ষাগারে মডেল পরীক্ষা করলে ডানার নকশা এবং প্রযুক্তি কোনওটাই নির্ভরযোগ্য হবে না।


আচ্ছা এবার দেখা যাক, একজন জীববিদের গবেষণায় রেনল্ডস সংখ্যা কীভাবে প্রাসঙ্গিক। বিপুলা এ পৃথিবীতে আমরা যতরকমের প্রাণী দেখতে পাই – ক্ষুদ্র কীটাণু থেকে শুরু করে সমুদ্রের নীল তিমি পর্যন্ত – তাদের সাইজ অনুযায়ী প্রবাহী তরল বা বায়ুর মধ্যে তাদের গতিবেগনির্ভর রেনল্ডস সংখ্যার পরিধি এক কথায় বিশাল। নীচের তালিকা দেখুন :


জীবজগতে রেনল্ডস সংখ্যার প্রসার-ক্রম। স্টিভেন ভোগেল-এর বই থেকে প্রাপ্ত তালিকা।


তালিকাটি এক নজরে দেখলেই বোঝা যাবে সমগ্র জীবজগতে রেনল্ডস সংখ্যার মান প্রায় ১৪টি প্রসার-ক্রম (orders of magnitude) জুড়ে বিস্তৃত! একটি নীল তিমির গতিবিধি বিরাট বড় রেনল্ডস সংখ্যা দিয়ে বর্ণনা করা যাবে। অর্থাৎ, নীল তিমির সাঁতারের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র জড়তা বল দিয়েই তার গতিবিধি হিসেব করা সম্ভব। এক একটি লেজের ঝাপটায় নীল তিমি পেরিয়ে যেতে পারে বিপুল দূরত্ব। অপরদিকে ব্যাকটিরিয়ার অবস্থান খুব ছোটো রেনল্ডস সংখ্যার জগতে। ছোট রেনল্ডস সংখ্যার জীবজগত (Life at low Reynolds Number) শীর্ষক একটি অনবদ্য বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে পদার্থবিদ এডওয়ার্ড পারসেল (Edward Purcell) অঙ্ক কষে দেখিয়েছিলেন যে একটি ব্যাকটিরিয়াকে জোরে ধাক্কা দিয়ে ছেড়ে দিলে সেটি একটি হাইড্রোজেন পরমাণুর ব্যাসের দশভাগের একভাগ মাত্র দূরত্ব এগিয়েই থেমে যাবে। এবং এইটুকু দূরত্ব যেতে ব্যাকটিরিয়াটির সময় লাগবে ১ সেকেন্ডের ১০ লক্ষ ভাগের ৩ ভাগ। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে ব্যাকটিরিয়ার মত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণীদের জগতে জড়তা বলের বিশেষ কোনও ভূমিকাই নেই। সান্দ্রতা বলেরই একাধিপত্য বলা চলে।


আবার যেমন, ঈল মাছ এবং শুক্রাণু – এই দুই প্রাণীর মধ্যে আকৃতিগত মিল থাকলেও তাদের গতিবিধির পদ্ধতিতে কোনও মিলই খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেহেতু তাদের রেনল্ডস সংখ্যার মধ্যে রয়েছে যোজন ব্যবধান। এই সব জেনে নিয়ে এবার আমরা এই লেখার শিরোনামের প্রশ্নটি করে ফেলতে পারি। যদি আমরা কোনওভাবে শুক্রাণু বা ব্যাকটিরিয়াদের জগতে চলে যেতে পারতাম তাহলে ঠিক কেমন হত আমাদের চলাফেরার পদ্ধতি? এই প্রশ্নের উত্তর কল্পনা করতে হলে চলে যেতে হবে খুব খুব ছোট রেনল্ডস সংখ্যার পরিধিতে। মানুষের আকৃতি যেহেতু এই ছোট জীবদের থেকে অনেকানেক বড়, তাই আমরা রেনল্ডস সংখ্যা নামিয়ে আনতে কল্পনা করতে পারি যে আমরা সাঁতার কাটছি ঘন এবং সান্দ্র কোনও তরলের ভিতর। পারসেল হিসেব করে দেখান যে একটি মানুষ যদি ঘড়ির কাঁটার গতিতে ঝোলাগুড়ের সমুদ্রে সাঁতার কাটে তাহলে তার যে রেনল্ডস সংখ্যা হয়, সেটা খানিকটা এই ছোট জীবদের রেনল্ডস সংখ্যার সমতুল্য হবে (অবশ্য সত্যিসত্যি মানুষের পক্ষে ঝোলাগুড়ের সমুদ্রে সাঁতার কাটা বিপজ্জনক, তাই সে চেষ্টা না করাই ভাল)! এই রকম পরিস্থিতিতে কয়েক সপ্তাহ লাগাতার সাঁতার কেটে যদি কয়েক মিটার এগোনো যায়, তবে তা খানিকটা ছোট জীবদের চলাফেরাকে বুঝতে সাহায্য করবে।


অতএব দেখা যাচ্ছে, জীববিদ রিচার্ড ডকিন্স (Richard Dawkins) বর্ণিত ‘মধ্যপৃথিবী’ (Middle World)-র বাসিন্দাদের পক্ষে জীবনধারণ খুবই পরিশ্রমসাধ্য এবং কষ্টকর একটি অভিজ্ঞতা। অথচ এই দুঃসাধ্যতার বাধা অতিক্রম করেই আমাদের জগতের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণীরা টিকে আছে।


প্রকৃত প্রস্তাবে, আমাদের এতক্ষণের আলোচনা করা কারণ ছাড়া আরও একটি কারণে ছোট প্রাণীদের চলাফেরা করা দুরূহ হয়ে ওঠে। গ্লিসারিনের পাত্রে ঘূর্ণায়মান কালির ফোঁটার যে ভিডিওটা প্রথমেই দেখেছিলেন, মনে পড়ে? কালির বিন্দুগুলো পাক খেয়ে খেয়ে গ্লিসারিনের মধ্যে মিশে যাওয়ার পর সমসংখ্যক উল্টো পাক দেওয়ার পর আবার ম্যাজিকের মত কালি আর গ্লিসারিন আলাদা হয়ে শুরুর অবস্থায় ফিরে গিয়েছিল। তার কারণ, রেনল্ডস সংখ্যার মান যখন খুব কম থাকে, তখন প্রবাহ বিপরীতকরণযোগ্য (reversible) হয়। এটাকে গাণিতিক ভাবেও বোঝা সম্ভব। সান্দ্রতা বলের তুলনায় জড়তা বলের যখন কোনও ভূমিকাই থাকে না (low Reynolds number), তখন সেই চরম সীমায় প্রবাহীর গতিপ্রকৃতি বর্ণনা করা জটিল সমীকরণগুলি সরলীকৃত হয়ে যায়। এগুলির সমাধান করা সহজ, এবং এই সরলীকৃত সমীকরণ সময়ের ওপর নির্ভরশীল নয় (time-independent)। তাই ইউটিউব ভিডিওটি প্রথম থেকে শেষ অবধি দেখার বদলে শেষ থেকে চালিয়ে শুরু পর্যন্ত গেলেও তফাৎ বুঝতে পারা যাবে না।


এডওয়ার্ড পার্সেলের নোটবই থেকে: 'ঝিনুক সূত্র' Scallop Theorem (১৯৭৬)


ছোট প্রাণীদের রোজকার জীবনে এই বিপরীতকরণযোগ্যতার পরিণাম কিন্তু মারাত্মক! এর মানে দাঁড়ায় এই যে তাদের শরীরের কোনও অংশকে বৈঠার মত শুধুমাত্র আগুপিছু করে তারা তাদের বিপরীতকরণযোগ্য পারিপার্শ্বিক মিডিয়ামে এক পা-ও এগোতে পারবে না। যদি আগু-ঘায়ে একটুখানি এগোয়, তবে পিছু-ঘায়ে আবার সমপরিমাণ পিছিয়ে পড়বে! কোনওরকম পুনরাবৃত্ত ক্রিয়ার সাহায্যেই তাদের পক্ষে চলাফেরা করা অসম্ভব হবে। যেমন, ঝিনুক জাতীয় প্রাণীরা জলে সাঁতার কাটে দুই খোলার মাঝখানে তাদের হাঁ-মুখ একাদিক্রমে খুলে আর বন্ধ করে। কিন্তু নিচু রেনল্ডস সংখ্যার জগতে এই পুনরাবৃত্ত পদ্ধতিতে ঝিনুকের পক্ষে কিছুমাত্র নড়াচড়া করা সম্ভব হবে না।


কী, আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না তো? বিশ্বাস করতে হবে না, বরং নিজের চোখেই পরীক্ষা করে দেখে নিন। রাবার-ব্যান্ড দিয়ে তৈরি খেলনাটি মানুষ বা মাছ-সাঁতারুর মতই পুনরাবৃত্ত ক্রিয়ার সাহায্যে জলের মধ্যে কেমন করে এগিয়ে চলে সেটার ভিডিও প্রথমে দেখে ফেলুন।


অসাধারণ সাঁতারু খেলনা, তাই না? এবার দেখুন, সেই একই খেলনাকে একটি অতি সান্দ্র তরলের (corn syrup) মধ্যে ফেললে কী হয়! অতি সান্দ্র তরলের প্রবাহের বিপরীতকরণযোগ্যতার ফলে খেলনাটি আগের মত পুনরাবৃত্ত ক্রিয়ার কায়দায় একেবারেই এগোতে পারে না।


তাহলে মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, জীবজগতের অসংখ্য ছোট ছোট প্রাণীরা অত নিচু রেনল্ডস সংখ্যার প্রবাহে আদৌ চলাফেরা করে কীভাবে? এর উত্তর হল অভিযোজন (adaptation)। পারিপার্শ্বিকের প্রতিকূল পরিস্থিতি অনুযায়ী তারা তাদের শরীরের যন্ত্রাংশগুলিকে চলাফেরার উপযুক্ত কায়দায় অভিযোজিত করে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়। মাথায় রাখতে হবে যে নিচু রেনল্ডস সংখ্যার প্রবাহে চলাফেরা করার মূল বাধা বিপরীতকরণযোগ্যতা (পার্সেলের “ঝিনুক সূত্র” মনে করুন!)। সেই বাধাকে কীভাবে এই ছোট প্রাণীরা অতিক্রম করে তার দুটো উদাহরণ আমরা দেখব।


প্যারামিসিয়াম-এর মত এককোষী প্রাণীদের দেহে চুলের মত আকৃতির সরু সরু অসংখ্য রোঁয়া থাকে। এই রোঁয়াগুলিকে বলে সিলিয়া (cilia)। এই প্রাণীরা সাঁতারের সময় রোঁয়াগুলিকে নৌকোর বৈঠার মত আগুপিছু করে ব্যবহার করে। কিন্তু পুনরাবৃত্ত ক্রিয়ার বিপরীতকরণযোগ্যতা ভাঙতে যে কায়দাটি করে তা হল আগু-ঘায়ে রোঁয়াগুলি খাড়া খাড়া করে রাখে, ফলে পারিপার্শ্বিকের তরলের সঙ্গে অনেক বেশি পরিমাণে ঘর্ষণ উৎপন্ন হয়। কিন্তু পিছু-ঘায়ে রোঁয়াগুলিকে সংকুচিত করে রাখে, ফলে তরলের সঙ্গে ঘর্ষণ কমে যায়। এই asymmetry-র সাহায্যে “ঝিনুক সূত্র”-র বাধা কাটিয়ে প্যারামিসিয়াম জাতীয় এককোষীরা অতিসান্দ্র তরলের মধ্যেও নড়েচড়ে খাদ্য সংগ্রহ করতে সমর্থ হয়।


ইলেকট্রন অনুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখা প্যারামিসিয়ামের (paramecium) ছবি। চুলের মত আকৃতির সিলিয়া (cilia)-গুলিকে নৌকোর বৈঠার মত ব্যবহার করে এরা চলাফেরা করে।



বাঁ থেকে ডান দিকে : সিলিয়া-র আগুপিছুর সাহায্যে প্যারামিসিয়ামের সাঁতার। আগু-ঘায়ে সিলিয়া-গুলি প্রলম্বিত অবস্থায় থাকে, ফলে চারপাশের তরলের সঙ্গে সান্দ্রতা জনিত ঘর্ষণ বেশি তৈরি হয়। পিছু-ঘায়ের সময়ে সিলিয়াগুলি সংকুচিত হয় এবং ফলে তরলের সঙ্গে ঘর্ষণ খুবই কম হয়। এই অপ্রতিসাম্যের ফলে আগু-ঘায়ে প্যারামিসিয়াম যতটা এগিয়ে যায়, পিছু-ঘায়ে ততটা পিছিয়ে আসে না। (তৈলাক্ত বাঁশে বাঁদরের চড়ার গল্প মনে করুন!)


অপরদিকে, ব্যাকটিরিয়া বা শুক্রাণুরা অতিসান্দ্র তরলে চলাফেরা করার জন্য যে সমাধানসূত্র অবলম্বন করে তা আরও নাটকীয়। এদের দেহের পশ্চাদপ্রান্তে থাকে একটি চাবুকাকৃতি ফ্লাজেলাম (flagellum)। এই ফ্লাজেলামটিকে এরা স্ক্রু-র মত পঁেচালো ভঙ্গিতে ব্যবহার করে। পেরেক বা স্ক্রু যেমন কোনওরকম পুনরাবৃত্ত ক্রিয়া ছাড়াই প্যাঁচ দিয়ে দিয়ে সামনে এগিয়ে চলে তেমনই ফ্লাজেলাকে পঁেচালো চাবুকের মত ব্যবহার করে সর্পিল গতিতে এই জীবরা অতিসান্দ্র পারিপার্শ্বিকের মধ্যে সাঁতার কাটে।


প্যারামিসিয়াম যেমন সাঁতারের জন্য সিলিয়াকে বৈঠার মত ব্যবহার করে, ব্যাকটিরিয়া বা শুক্রাণু-রা সাঁতার কাটে ফ্লাজেলাম (flagellum)-কে স্ক্রু অথবা প্রপেলার-এর মত ব্যবহার করে। দু'টি পদ্ধতিই খুব নিচু রেনল্ডস সংখ্যার প্রবাহে চলাফেরা করার জন্য অভিযোজিত।


এই কায়দা যে সত্যিই কাজ করে তার প্রমাণ চাই? বেশ! আমাদের সেই রাবারব্যান্ড দিয়ে তৈরি খেলনাটির ডিজাইন এবার সামান্য পরিবর্তন করে নেওয়া যাক, যাতে পুনরাবৃত্ত আগুপিছু ক্রিয়ার বদলে পঁেচালো একটি প্রপেলারের সাহায্যে এটি নড়াচড়া করতে পারে। এবার একে অতিসান্দ্র তরলে (corn syrup) আবার ছেড়ে দিলে খেলনাটি খুব ধীরে ধীরে সাঁতরে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। তত্ত্বের হাতেনাতে প্রমাণ একেই বলে।


শুক্রাণুদের সাঁতারের গল্প আজকের মত এখানেই শেষ করা যাক। এই আলোচনায় আমরা দেখলাম, যে অতিসান্দ্র জগতের বাসিন্দা ছোট প্রাণীদের চলাফেরার বিষয়টি অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক। বিজ্ঞানের সূত্রাবলীর সাহায্যে আমরা বুঝতে পারলাম ছোটো রেনল্ডস সংখ্যার দুনিয়ায় নড়েচড়ে বেড়ানোর বা সাঁতার কাটার নিয়মগুলি, যা কিনা আমাদের চারপাশের দুনিয়ায় চলাফেরার নিয়মের থেকে অনেকখানিই আলাদা। হয়তো এই নবলব্ধ জ্ঞানের সাহায্যে আমরা এবার অতিসান্দ্র তরলে চলার উপযোগী জাহাজের নকশা তৈরি করতে পারব। কিন্তু প্রাকৃতিক জগতে বিবর্তনের নিয়মে এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র না-মানুষ প্রাণীরা চমকপ্রদ অভিযোজনের সাহায্যে আমাদের অনেক আগেই তাদের জীবনধারণের প্রয়োজনীয় সমাধানসূত্র খুঁজে বের করে ফেলেছে।


_________________________
বাংলায় অনুবাদ এবং সম্পাদনা : কস্তুরী


*আমাদের বন্ধু এবং অতিথি লেখক আতীশ ভাটিয়া রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োফিজিক্স নিয়ে গবেষণা করেন।

About these ads
Comments
5 Responses to “শুক্রাণুদের সাঁতার অথবা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণীদের গতিবিধির কিসসা”
  1. Bikash Chakravarty says:

    বিজ্ঞানে অজ্ঞানতার কারণে বিজ্ঞানের জ্ঞান আহরণে আমি সদা উৎসাহী।এই প্রবন্ধটি পড়ে এবং তৎসম্বলিত ভিডিওগুলি দেখে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান পরিধিকে বাড়াতে পেরে খুবই খুশী হলাম।অযান্ত্রিকের প্রকাশকদের এবং এই প্রবন্ধের অনুবাদককে অসংখ্য ধন্যবাদ।আপনারা প্রকৃত দেশসেবা কার্য্যে নিয়োজিত আছেন।

  2. subhaditya123 says:

    অসাধারণ ! ফাটাফাটি ! দুর্দান্ত ! যেমন বিজ্ঞান তেমন লেখা ! অনেক শিখলাম |

  3. jbubach says:

    বেড়ে লিখেছিস কিন্তু … আর ভিডিওগুলো জিও টাইপ

  4. jbubach says:

    তুই আর আতীশ, দুজনকেই বললাম :)

  5. Somenath Bakshi says:

    darun laglo … prochur dhanyabad ar subhecha roilo …

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

  • ফেসবুক

  • নতুন লেখা ইমেলে পেতে এখানে নিজের ইমেল ঠিকানা দিন

    Join 20 other followers

  • লেখক

  • পরিসংখ্যান

    • 6,579 hits
Follow

Get every new post delivered to your Inbox.

%d bloggers like this: